জীবন যুদ্ধে জয়ী দুই নারী দুলালী ও চানমনি

এম রুহুল আমিন,   দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে দারিদ্র্যতাকে পরাজয় করে জীবন যুদ্ধে জয়ী দুই আদিবাসী নারী দুলালী ও চানমনি। বসবাস উপজেলার প্রত্যন্ত গ্রাম অঞ্চলে।

স্বামীর সংসারে দুমুঠো ভাত আর মোটা কাপড় পাওয়া ছিল বড় কামনা। স্বামী সংসারে দারিদ্র্যতার কারণে অসহায়ত্ব জীবন যাপন করত ওই দুই নারী।

দারিদ্র্যতার নির্মম কষাঘাত এত বেশী আক্রমন করেছিল সংসার জীবন তাদের জীবনে ছিল একটি দুষ্কর জীবন। ল্যাম্ব দুর্যোগ ঝুকি হ্রাস প্রকল্পের আওতায় এসে বেসরকারি সংস্থার মাঠ পর্যায়ে কর্মী ও কর্মকর্তাদের সহায়তায় প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে দুলালী গ্রামেই দেয় মুদিখানার দোকান। আর চানমনি বাড়ি সংলগ্ন পরিত্যক্ত জায়গায় গড়ে তোলে সবজি বাগান। এখন ওই দুই নারী ভাগ্যের উন্নয়নের চাকা ঘুরিয়েছে। সমাজে অবস্থান করে নিয়েছে সচ্ছল্যতা।

দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার বিনোদনগর ইউনিয়নের অন্তর্গত একটি গ্রাম খামার দেবীপুর। এই গ্রামের আদিবাসী পাড়ায় বসবাস করেন দুলালি সরেন। দুলালির স্বামীর নাম সুধীর কিস্কু, তিনি একজন দিনমুজুর। অন্যের জমি নিয়ে মাঝে মাঝে বর্গাচাষ করেন। তাদের একজন ছেলে ও তিনজন মেয়ে সন্তান আছে। বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে, দ্বিতীয় মেয়ে কলেজে পড়াশুনা করে এবং ছেলে ও সবেমাত্র কলেজে পা দিয়েছে। সবার ছোট মেয়েটি প্রাথমিক স্কুলে পড়াশুনা করছে। দুলালি তার পরিবার নিয়ে শ্বশুরবাড়িতে শ্বশুরের সঙ্গে ছোট ছোট ঘরে বসবাস করে।

তারা শালোম প্রেসবিটারিয়ান চার্চের সদস্য। পরিবারের সকলে নিয়মিত উপাসনায় যায়। দুলালি লেখাপড়া তেমন না করলেও লেখাপড়ার গুরুত্ব সম্পর্কে অবগত ও সচেতন। সে বলে আমাদের বর্তমান হাতিয়ার লেখাপড়া। তাই সে তার সন্তানদের লেখাপড়া করিয়ে চলেছে। লেখাপড়া গুরুত্ব সম্পর্কে জানলেও সে সন্তানদের পড়াশুনা করাতে বাধাগ্রস্থ পারিবারিক অভাবের কারণে। ল্যাম্বের সহযোগীতায় ২০১৬খ্রি. ৭ই আগষ্ট ১১জন সদস্য নিয়ে একটি দল গঠিত হয়। দলটিতে সদস্যরা প্রতি সপ্তাহে মুষ্ঠি চাল জমা রাখে।

দলটির নাম জবা উন্নয়ন দল। দলটির জমার পরিমাণ আনুমানিক ১০,০০০/- টাকা। পরিবার যখন অভাবের কারণে সন্তানদের লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাবে এমন অবস্থায় দুলালি তার স্বামীর সঙ্গে পরামর্শ করে দল থেকে ৩,০০০/- টাকা ঋণ নিয়ে বাড়িতেই একটি ছোট মুদির দোকান দিয়ে বসে। দুলালির স্বামী মাঠে কাজ করে এবং দুলালি সেই দোকান পরিচালনা করে। দোকানে নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী অল্প করে রাখে। মহিলা দোকানী হওয়ার দরুন মহিলারাও তার দোকানে আসতে ইতস্তঃ করে না। অল্প দিনেই দুলালির দোকান অনেক বড় হতে থাকে।

বর্তমানে দুলালি প্রতিদিন ৫০০-৬০০/- টাকার মালামাল বিক্রি করে। দুলালি মনে করে সে যদি আরো পুজি বিনিয়োগ করতে পারে তবে আরো লাভ করা সম্ভব। বর্তমানে তার দোকানে ৮-১০ হাজার টাকার মালামাল রয়েছে। সন্তানদের স্কুল ফি, টিউশন ফি, খাতা কলম ও স্কুল ড্রেসের জন্য আর কোন চিন্তা করতে হয় না। দুলালির প্রার্থনা তার সন্তানেরা যাতে মানুষের মত মানুষ হতে পারে এবং তারা একটা নতুন বাড়ি দিতে পারে।

অপর চাদমনি দিনাজপুর জেলার নবাবগঞ্জ উপজেলার বিনোদনগর ইউনিয়নের অন্তর্গত একটি গ্রাম পাহাড়পুর। এই গ্রামের আদিবাসী পাড়া বসবাস করেন চাঁনমনি হাঁসদা। চাঁনমনির স্বামী সেভেনথ ডে এ্যাডভেন্টিস্ট চার্চের একজন পাস্টর। স্বামী পেশার পরিপ্রেক্ষিতে তাকেও তার স্বামীর সাথে এই গ্রামে বসবাস করতে হয়। যদিও তাদের গ্রামের বাড়ি দিনাজপুর জেলার ফুলবাড়ি উপজেলা অন্তর্গত পুকুরিয়া গ্রামে। তাদের এক ছেলেও এক মেয়ে সন্তান আছে।

তাদের মেয়ে বড় এবং সে এখন সপ্তম শ্রেণিতে পড়াশুনা করে। তাদের একমাত্র ছেলে এখন দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়াশুনা করে। তাদের দুই ছেলেমেয়ে তাদের চার্চের হোস্টেলে থেকে পড়াশুনা করে। চাঁনমনির স্বামী একজন শারীরিক প্রতিবন্ধী মানুষ। সে একপায়ে হাটা চলা করে। এক সড়ক র্দূঘটনায় তার এক পা অকেজো হয়ে পড়ে।

সুতরাং পালকীয় কাজ করা ছাড়া তার স্বামীর আর কোন কাজ করার উপায় নাই। কিন্তু তাদের সামান্য আয়ে তাদের পরিবার চলা বড়ই কঠিন। এমতাবস্থায় চাঁনমনির চিন্তা করে সে পরিবারকে কিভাবে সাপোর্ট করতে পারে। চাঁনমনি গ্রামের প্যাড গ্রুপের একজন সদস্য। ল্যাম্ব স্টাফরা দলে এসে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা দিয়ে থাকেন।

একদা একজন ল্যাম্ব স্টাফ বাড়ির আঙ্গিনায় কিভাবে সবজি চাষ করা যায় এবং তার মাধ্যমে পরিবারকে সাপোর্ট করা যায় তা শিক্ষা পান। চাঁনমনি ও তার পরিবার একটি চার্চ কোয়ার্টারে থাকে। তাদের ঘরের পাশে একখন্ড ফাঁকা জায়গা আছে। সেই ফাঁকা জায়গায় চাঁনমনির সবজি চাষ করার চিন্তা করেন। তার স্বামীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলাপ করেন। সে স্বামীকে বীজ এনে দিতে বলে এবং তা নিয়ে তার বাগানের কাজে লেগে পড়েন।

চাঁনমনি বাগানে এখন পুই, সিম সহ বিভিন্ন সবজি পাওয়া যায়। একটার পর একটা সবজি চাষের জন্য সে বাগান প্রস্তুত করে এবং সবজি চাষ করছে। তার বাড়ির সবজির জন্য আর বাজার করতে হয় না এবং সবকিছু সে সেখান থেকে টাটকা পেয়ে থাকে। সে বাড়ির খরচের এক বড় অংশ বাগান থেকে যোগান দিয়ে থাকে এবং অতিরিক্ত সবজি বিক্রি করে সে বাড়তি আয় করছে। চাঁনমনি এখন খুবই তার স্বামীকে নিয়ে এবং তার বাগান নিয়ে। চাঁনমনির স্বপ্ন- তার ছেলেমেয়েরা মানুষের মত মানুষ হবে।

image_printপ্রিন্ট

শেয়ার

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।